রাজনীতিতে এনসিপি’র মিত্র কারা
- আপলোড সময় : ২২-১০-২০২৫ ০৮:৪৮:২৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-১০-২০২৫ ০৮:৪৮:২৭ পূর্বাহ্ন
সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
রাজনীতির সাম্প্রতিক সমীকরণে ভিন্ন রাজনীতিতে হাঁটতে শুরু করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতারা বলছেন, শুরু থেকেই তারা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিলেন। এখনও সে অবস্থানেই আছেন। জনগণের ওপর ভরসা রেখে আগামী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকবেন। তারা মনে করছেন, আগামীতে তারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন, নয় তো শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করবে।
এদিকে বিএনপি ও জামায়াত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির যাত্রা করেছেন বলেও অভিমত দিয়েছেন এনসিপি নেতারা। যদিও বিএনপি থেকে বলা হচ্ছে, দলটিকে জুলাই আন্দোলনের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে এনসিপিসহ একটা গোষ্ঠী। অন্যদিকে জামায়াত থেকে বলা হচ্ছে এনসিপি নেতারা যা বলছেন, সেটা অপরিপক্ব ও আবেগনির্ভর।
সম্প্রতি জুলাই যোদ্ধাদের উচ্ছৃঙ্খল লোক বলে মন্তব্য করে এনসিপি নেতাদের তোপের মুখে পড়েন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর একদিন পর গত রবিবার জামায়াতের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) আন্দোলনকে রাজনৈতিক প্রতারণা আখ্যা দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, জামায়াতে ইসলামী কথিত পিআর আন্দোলনের নামে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে- এটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রতারণা। তার অভিযোগ, জামায়াত ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রক্রিয়া এবং জাতীয় সংলাপকে গণ-অভ্যুত্থানের দাবির আলো থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও সংস্কারের মূল লক্ষ্য বিকৃত হচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, জুলাই সনদ স্বাক্ষর এবং এর বাস্তবায়ন নিয়ে মতভিন্নতা থেকেই এনসিপির এই প্রতিক্রিয়া এসেছে। বিএনপি, জামায়াতসহ ২৫টি দল জুলাইয়ে সনদে স্বাক্ষর করলেও এনসিপি করেনি। দলটি বলছে, সনদের আইনি কাঠামো না থাকলে তা অর্থহীন। জামায়াত শেষ মুহূর্তে সই করে। এই সিদ্ধান্তে এনসিপি নেতৃত্বের ভেতর হতাশা জন্ম নেয়। জামায়াত ও এনসিপি উভয় সূত্রই নিশ্চিত করেছে, সনদে স্বাক্ষরের আগের দিন এনসিপির নেতারা জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ও হামিদুর রহমান আযাদের সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন- ‘সই করবেন না, বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।’
কিন্তু জামায়াত রাজি হয়নি। তাদের যুক্তি ছিল, সই না করলে সনদের রাজনৈতিক গুরুত্ব হারাবে, সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে যাবে। মনে করা হচ্ছে, এর পর থেকেই দুই দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
এনসিপি চাইছিল, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে একটি গণপরিষদ গঠন করা হোক, যা ভবিষ্যৎ সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেবে। কিন্তু জামায়াতের অবস্থান ছিল ভিন্ন- তারা চায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে সংসদের নি¤œকক্ষে সংস্কার। দুই প্রস্তাবই সাংবিধানিক সংস্কারের ভিন্ন রূপ, কিন্তু কে নেতৃত্ব দেবে সেই প্রশ্নেই সম্পর্কের টানাপড়েন।
জুলাইয়ের পর থেকে একাধিক দফায় জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সঙ্গে বৈঠক করেছে এনসিপি। তাদের উদ্যোগে এই বৈঠকগুলো হয়। তখন যুগপৎ আন্দোলনের আলোচনা চলছিল। নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়েও বৈঠক করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। কিন্তু সেপ্টেম্বরে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ সাতটি দল মাঠে নামলেও এনসিপি ও তাদের কয়েকটি সহযোগী পিছু হটে। তাদের বক্তব্য ছিলÑ ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে এক মঞ্চে গেলে সংস্কার আন্দোলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে। খেলাফত মজলিসের এক নেতা তখন বলেছিলেন, অন্যদের মাঠে নামিয়ে এনসিপির সরে যাওয়ায় তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
জানা যায়, ভেতরে ভেতরে নতুন অবস্থান গঠন করতে শুরু করে এনসিপি। তারা চায়, সংসদীয় সংস্কারের দাবির বাইরে গিয়ে বৃহত্তর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের আলোচনা। ঐকমত্য কমিশনের অধীনে আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন ও গণভোটের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু জামায়াতের সমর্থন পায়নি। এনসিপির মতে, জামায়াতের অংশগ্রহণ কেবল রাজনৈতিক কৌশল, সংস্কারের প্রতি আন্তরিক অঙ্গীকার নয়।
জামায়াত অবশ্য বিষয়টিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছে। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেন, তরুণদের দল এনসিপি যেটা বলছে সেটা অপরিপক্ব ও আবেগনির্ভর। জামায়াত দায়িত্বশীল দল। আমরা এমন কিছু করব না, যাতে সংস্কার বা নির্বাচন ঝুঁকিতে পড়ে। তিনি দাবি করেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও বাস্তবায়নে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াত।
এ বিষয়ে গত সোমবার জয়পুরহাটে এক অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম সাংবাদিকদের বলেন, আগামী জাতীয় সংসদে নির্ধারকের জায়গায় থাকবে এনসিপি। তিনি বলেন, সরকারি দল হিসেবে এনসিপি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে, নয় তো শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করবে। আমরা জাতীয় পার্টির মতো পোষা বিরোধী দল হিসেবে রাজনীতি করতে আসিনি। বাংলাদেশে যদি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল থাকে এবং প্রথম ও দ্বিতীয় দলের ভোট কাছাকাছি হয়, তা হলে তৃতীয় দলই নির্ধারণ করে কে সরকার গঠন করবে। এনসিপি সেই তৃতীয় শক্তি হিসেবে আগামী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কিন্তু এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, এনসিপি প্রথম থেকেই ক্ষমতা কাঠামোর ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে চিন্তা করছে। ক্ষমতার ভারসাম্য, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বাতিল বিবেচনায় মৌলিক সংস্কারে বেশকিছু প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সেগুলোর অনেকগুলো সংযোজন হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ চার-পাঁচটা প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া। মূলত এই জায়গাটাই রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে একটা দূরত্ব। তিনি বলেন, আমরা প্রথম থেকেই ক্ষমতা কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের জন্য বলেছিলাম। সেটা হচ্ছে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এবং আগামী নির্বাচন গণপরিষদ নির্বাচন করা। কিন্তু আমরা দেখেছি বাকি দলগুলো তারা তাদের দলীয় এজেন্ডা অনুযায়ী চাইছে। বিএনপি যখন চিন্তা করে তাদের ক্ষমতায় যাওয়া দরকার; তাই তারা জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করে। আবার ক্ষমতায় যাওয়ার ক্ষেত্রে যার সঙ্গে দূরত্ব করা দরকার, তারা সেই দূরত্ব তৈরি করে।
আদীব বলেন, আমাদের ক্ষেত্রে জোটের প্রশ্নটা আসছে সংস্কার ইস্যুতে মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে। উচ্চকক্ষ পিআর এটা এবং একই সঙ্গে মৌলিক সংস্কারের দাবির সঙ্গে কিছু দল কাছাকাছি আছে। যেমন- রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, গণসংহতি আন্দোলন, গণতন্ত্র মঞ্চ গণ-অধিকার পরিষদ পার্টি। তাদের সঙ্গে আমাদের ধরনের আলোচনা আছে। এটা আসলে আরো কিছুদিন পরে একটা পরিণতির দিকে যাবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপিকে জুলাই অভ্যুত্থানের বিপরীতে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা চলছে, সেটা ব্যর্থ হবে। কিন্তু এনসিপির ভেতরে ধারণা, বিএনপি একদিকে সনদে সই করে, অন্যদিকে আন্দোলনের ক্ষেত্রে জামায়াতের ওপর নির্ভর করছে- যা সংস্কার রাজনীতির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।
জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের পাশাপাশি এনসিপি বামমুখী অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। সম্প্রতি সংস্কারবাদী কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে তারা যৌথ বৈঠক করেছে, যেখানে গণপরিষদভিত্তিক সংবিধান পুনর্লিখন প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আসে। এনসিপি এখন এই প্ল্যাটফর্মে নিজেকে আলাদা শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তাদের লক্ষ্য, জামায়াত-বিএনপি জোটের বাইরে গিয়ে সংস্কার রাজনীতির নেতৃত্ব নেওয়া। তবে এনসিপির এই অবস্থান কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে রাজনৈতিক মহলে। একদিকে তারা বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে নির্বাচনী হিসাব-নিকাশে; অন্যদিকে একই জোটকে ‘প্রতারণার রাজনীতি’ বলে সমালোচনা করছে। মনে করা হচ্ছে, এই দ্বৈত অবস্থান দলটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণœ করতে পারে।
এনসিপি বর্তমানে ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে সংস্কার রাজনীতির নেতৃত্ব ধরে রাখার চাপ, অন্যদিকে নির্বাচনের বাস্তব রাজনীতিতে টিকে থাকার প্রয়োজনÑ এই দুইয়ের টানেই বিভক্ত হচ্ছে দলের ভেতরকার সিদ্ধান্ত। তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে একটি অংশ মনে করছে, জামায়াত ও বিএনপি- উভয় পুরনো রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে এনসিপিকে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়তে হবে। আবার অন্য অংশ মনে করছে, বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের বাইরে থাকলে দল প্রান্তিক হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্য কেবল একটি প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এনসিপির দিক বদলের ইঙ্গিত। এক বছরের ভেতর যে দলটি সংস্কারের নতুন ধারার প্রতীক হয়ে উঠেছিল, সেই দল এখন নিজের অবস্থান নির্ধারণে লড়ছে। সামনে নির্বাচন, আর তার আগেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এই সমীকরণে এনসিপি কোন পথে হাঁটবে- সংস্কার রাজনীতির বিকল্প শক্তি হয়ে, নাকি পুরোনো জোট রাজনীতির অংশ হয়ে- সময়ই বলবে। -আমাদের সময়
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক